
আবুজর গিফারী, পাবনা প্রতিনিধি:
পাবনার সাঁথিয়ায় সরকারি নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে উঠেছে কোটি কোটি টাকার ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ। নতুন ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী আবেদনকারীরা। এই অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের সাথে সরাসরি কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার দাবিও তুলেছেন তারা।
কৃষিপ্রধান উপজেলা হওয়ায় সাঁথিয়ায় সারের চাহিদা বেশ ব্যাপক। তবে অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের নীতিমালা না মেনে অতীতেও মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে নির্ধারিত ১১ জন ডিলারের জায়গায় ৩১ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে অনেকেই ডিলারশিপের লাইসেন্স তৈরি করে ভিন্ন ব্যক্তির নামে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী দ্বিগুণ ডিলার থাকার পরও সাঁথিয়ায় তীব্র সার সংকট দেখা দিয়েছে। ১১শ টাকা দামের সারের বস্তা কৃষকদের কিনতে হচ্ছে ১৪শ টাকায়। মাঠপর্যায়ের কৃষি সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, সারের এই তীব্র সংকটের কারণে চলতি মৌসুমে কৃষি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
চলমান সার সংকট নিরসনে সম্প্রতি সাঁথিয়া উপজেলায় নতুন করে আরও ১১ জন ডিলার নিয়োগের ঘোষণা দেয় সরকার। এর বিপরীতে মোট ১৭৯ জন ব্যবসায়ী আবেদন করেন। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে ৩৩ জনের একটি তালিকা জেলা কমিটিতে পাঠায়। কিন্তু এই অতিরিক্ত আবেদনের সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ওই প্রভাবশালী চক্রটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারী ক্ষোভ ও ভয় প্রকাশ করে জানান, “কারা এই টাকা তুলছে বা ঘুষবাণিজ্য করছে তাদের নাম প্রকাশ্যে বললে ঘুষের টাকাও ফেরত পাব না, আর ডিলারশিপের লাইসেন্সও পাব না।”
পৌরসভা এলাকা থেকে ডিলারশিপের জন্য আবেদনকারী বকুল হোসেন জানান, সরকারি সব শর্ত মেনে আবেদন করলেও প্রভাবশালী একটি চক্র তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—টাকা না দিলে ডিলারশিপ মিলবে না। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক আবেদনকারী মতিন ফকির হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “যাদের কাগজপত্র সব ঠিক আছে, তারা বাদ পড়ে যাচ্ছে কেবল ঘুষ না দেওয়ার কারণে। শুনেছি যারা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে পেরেছে, তাদের নামই জেলাতে পাঠানো হয়েছে।”
বাছাইকৃতদের তালিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তাদের সাথে লবিং ও ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন পৌরসভার নিয়ামত আলী এবং সাঁথিয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তি (যিনি চাকরিজীবী হওয়ায় নিজ ছেলের নামে আবেদন করেছেন)। এ ছাড়া কাশিনাথপুর ইউনিয়নের ‘খাঁন এন্টারপ্রাইজ’-এর কর্তৃপক্ষের গুরুতর অভিযোগ, সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রাতের আঁধারে পক্ষপাতমূলকভাবে জেলাতে এই তালিকা পাঠিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা এ দুর্নীতি তদন্ত করে ‘রাতের আঁধারে’ প্রণীত এই তালিকা বাতিলের দাবি জানান।
তবে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন নাটোরের সিংড়ায় সদ্য বদলি হওয়া তৎকালীন সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “আমার এক টাকা ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ যদি কেউ দিতে পারে, তবে আমি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেব।”
এ বিষয়ে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম আহমেদ বলেন, “যদি কারও কাছে ঘুষ নেওয়ার নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে লিখিতভাবে আমাদের জানান; তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তালিকা জেলাতে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু কাদের নাম তালিকায় গেছে তা চূড়ান্ত হওয়ার আগে কারও জানার কথা নয়। যাদের নাম তালিকায় রয়েছে, তারা নিজেরা এসে বলুক যে তারা ঘুষ দিয়েছে।”




