
আব্দুল্লাহ আল মামুন পিন্টু,টাঙ্গাইলঃ
জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে আষাঢ়ের শুরু — বাঙালির ‘মধু মাস’। আর এই মাস মানেই টাঙ্গাইলের বাজারজুড়ে আম-জাম-কাঁঠাল, লটকন, জামরুলের উৎসব। গ্রীষ্মের কড়া রোদের মাঝে রসালো ফলের সমাহারে এখন টইটম্বুর পৌরশহরের প্রতিটি ফলপট্টি।
ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহলে প্রাণ ফিরে পেয়েছে শহরের পার্ক বাজার, ছয় আনি বাজার, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, জগলু রোডের ফলপট্টিসহ বিভিন্ন ফলের বাজার। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টাঙ্গাইলের ফলের বাজারগুলোতে এখন ক্রেতার ঢল। ঝুড়ি ভর্তি আম, কাঁঠাল, লটকন, জামরুল নিয়ে ভ্যান-রিকশা থেকে শুরু করে দোকানে দোকানে বিক্রির মহোৎসব চলছে শহরে। গৃহিণী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী — সবাই ছুটছেন মধু মাসের স্বাদ নিতে। আর দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ক্রেতার মুখে সন্তুষ্টির হাসি।
বর্তমানে বাজারের প্রধান আকর্ষণ দেশি-বিদেশি জাতের আম। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সুরমা ফজলি ৪৫ টাকা কেজি, হাঁড়ি ভাঙ্গা ৭০ টাকা কেজি, ব্যানানা ম্যাংগো ১২০ টাকা, বারি-৪ ৭০ টাকা ও আম্রপালি ৮০ টাকা কেজি দরে। ইতিপূর্বে বিক্রি হয়েছে রাজশাহীর ল্যাংড়া, সাতক্ষীরার গোপালভোগ ও হিমসাগর।
নতুন মৌসুমের লটকন ১০০ টাকা কেজি, জামরুল ১২০ টাকা কেজি। কাঁঠাল আকারভেদে ৭০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও বাজারে উঠেছে আতাফল, জাম্বুরা ও বেল। দাবদাহের কারণে বেলের শরবতের চাহিদা এখন তুঙ্গে।
পার্ক বাজারের আড়তদার মোহাম্মদ আনোয়ার, আলমগীর, মনির, আব্দুল হক ও রফিক মিয়া জানান, “মধু মাস মানেই আমাদের কাছে বছরের সেরা মাস। জেলায় প্রতিদিন রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর থেকে ১৫-২০টি ট্রাক ফল আসছে। গত বছরের তুলনায় এবার ফলের ফলন ভালো হওয়ায় দামও কম। যে কারণে ফলের দোকানগুলোতে ক্রেতার ভিড় অনেক বেশি এবং পরিমাণেও বেশি কিনছেন তাঁরা।”
শুধু বড় আড়ত না, শহরের অলিগলিতেও এখন ফলের ভ্রাম্যমাণ দোকান বসেছে। জগলু রোডের তরুণ উদ্যোক্তা সাদিকুর রহমান জানান, “অনার্সে পড়ার পাশাপাশি এই ব্যবসা করছি। প্রতিদিন ৩০-৪০ কেজি আম বিক্রি হয়। মানুষ এখন সরাসরি বাগান থেকে আনা পাকা ফল কিনতে চায়।”
শহরের প্যারাডাইস পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল আলীম পরিবার নিয়ে ফল কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, “বছরের এই তিন মাস ছাড়া আর ফলের আসল স্বাদ পাওয়া যায় না। তাই বাচ্চাদের নিয়ে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ফল কিনছি।” তিনি ৪৫ টাকা কেজি দরে ৪ কেজি সুরমা ফজলি কিনেছেন।
আরেক ক্রেতা ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান জানান, তিনি ৭০ টাকা কেজি দরে ৫ কেজি হাঁড়িভাঙ্গা আম কিনেছেন। “বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই আম কিনছি।” বাজারে আমের দরে তিনি খুশি।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা সুলতানা বলেন, “কার্বাইড মিশ্রিত ফল খেলে পেটের পীড়া, মাথাব্যথা এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে। তাই ফল কেনার পর কমপক্ষে ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে, ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিত।”
এদিকে ভেজাল রোধে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার মনিটরিং জোরদার করেছে। জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আসাদুজ্জামান রোমেল জানান, “এখন আমের পূর্ণ মৌসুম। যে কারণে ফল পাকাতে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করছেন না। প্রাকৃতিক নিয়মেই বর্তমানে আম পাকানো হচ্ছে, তাই ভোক্তারা নির্দ্বিধায় আম কিনে খেতে পারেন।”
মধু মাস শুধু ব্যবসা না, টাঙ্গাইলের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও বড় সময়। বিশেষ করে মির্জাপুর, সখীপুর, ঘাটাইলের হাজারো কৃষক এই সময় কাঁঠাল বিক্রি করে সারা বছরের খরচ মেটান। অন্যদিকে শহরের মানুষের কাছে এটি আবেগের বিষয়। আম কাটা, জাম খাওয়া আর কাঁঠালের কোয়া ভাগাভাগি — মধু মাস মানেই উৎসব।
রোদ-গরমের এই দিনে টাঙ্গাইলের বাজার এখন প্রকৃতির দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহারে ভরা। ফলের মিষ্টি গন্ধে ভরে উঠুক টাঙ্গাইলের প্রতিটি ঘর।



