
জন্মের পর একটি শিশুর প্রথম আশ্রয় হওয়ার কথা মায়ের বুক। প্রথম স্পর্শ, প্রথম উষ্ণতা আর প্রথম নিরাপত্তা পাওয়ার কথা সেই মমতার কোলেই। অথচ পৃথিবীতে আসার পরই এক নবজাতক কন্যাশিশুর ভাগ্যে জুটেছিল রাস্তার ধারের নির্জনতা। যে ছোট্ট দুটি চোখ ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার আগেই খুলেছিল, সেগুলো যেন দেখেছিল নির্মম এক বাস্তবতা। তবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এখনো যে ফুরিয়ে যায়নি, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে মাধবপুরের এই ঘটনা।
সোমবার (৬ জুলাই) ভোরে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার উত্তর শাহপুর এলাকায় শায়েস্তাগঞ্জ-জগদীশপুর জেলা পরিষদ সড়কের পাশে কান্নার শব্দ শুনে পথচারীরা থমকে দাঁড়ান। কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান, একটি নবজাতক কন্যাশিশু পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। শিশুটির শরীরে তখনও হাসপাতালের স্যালাইনের ক্যানুলা লাগানো। দৃশ্যটি দেখে উপস্থিত মানুষের চোখ ভিজে ওঠে। কে বা কারা জন্মের পরই এমন নিষ্ঠুরভাবে শিশুটিকে ফেলে গেছে, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে সবার মনে।
খবর পেয়ে বাঘাসুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নবজাতকটিকে উদ্ধার করে মাধবপুরের ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসকদের আন্তরিক পরিচর্যায় শিশুটি সুস্থ হয়ে ওঠে। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে একটি সেফ হোমে স্থানান্তর করা হয়, যাতে তার নিরাপত্তা ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা যায়।
শিশুটির খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে অসহায় এই নবজাতক। অনেকেই তাকে নিজের সন্তান হিসেবে লালন-পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। মঙ্গলবার মাধবপুর উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভায় আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই শেষে উত্তর শাহপুর (নোয়াপাড়া) এলাকার ব্যবসায়ী জাবেদ আলী (৩০), পিতা শফর আলী, ও তাঁর স্ত্রীকে আপাতত শিশুটির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, শিশুটির সর্বোচ্চ স্বার্থ বিবেচনা করেই উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ড এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপাতত নিরাপদ পরিবেশে লালন-পালনের জন্য শিশুটিকে জাবেদ আলী দম্পতির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ এবং জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
নবজাতকটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হন জাবেদ আলী দম্পতি। তারা জানান, এই শিশুকে তারা কখনো পর মনে করবেন না। নিজেদের সন্তানের মতোই ভালোবাসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্নেহ দিয়ে বড় করে তুলবেন।