
কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে টাঙ্গাইল জেলার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী পাটি শিল্প। একসময় জেলার গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে তৈরি হতো বেতের তৈরি শীতল পাটি। গ্রামীণ জনপদের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বিয়ে-শাদি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা গরম দুপুরের আরামদায়ক মুহূর্তে পাটির ছিল ব্যাপক ব্যবহার। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের আগ্রাসনে এখন বিলুপ্তির পথে এ শিল্প।
একসময় টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী, ঘাটাইল, মির্জাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার, বাসাইল, ভূঞাপুর, গোপালপুর, সখীপুর, ধনবাড়ী, মধুপুর ও টাঙ্গাইল সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে পাটি শিল্প ছিল লাভজনক ও সম্ভাবনাময় কুটির শিল্প। বিশেষ করে কালিহাতী উপজেলার বাংড়া, সিলিমপুর, খিলদা, ধুনাইল, এলেঙ্গা, লাঙ্গলজোড়া, ঘূনি, সালেংকা, পাটিতাপাড়া, পিচুটিয়া, আউলটিয়া ও মহিষজোড়াসহ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো ছিল এ শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রায় দুই লক্ষাধিক শ্রমিক ও কারিগর। উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল বেতের ক্ষেত। সেই বেত সংগ্রহ করে তৈরি হতো শীতল পাটি, বুকা পাটি, ছাইলা ও আতি। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এসব পণ্য পৌঁছে যেত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে পাটির চাহিদা। বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি পাটি ও আধুনিক সামগ্রীর সহজলভ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী বেতের পাটির বাজার প্রায় হারিয়ে গেছে। ফলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে পেশা বদল করেছেন, আবার অনেক পরিবার জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছেন ভারতে।
উপজেলা পাটি শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক হরে কৃষ্ণ পাল বলেন, “একসময় এই শিল্পে দুই লক্ষের বেশি মানুষ কাজ করতো। এখন বাজার সংকুচিত হয়ে গেছে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এ শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।”
সিলিমপুর গ্রামের পাটি কারিগর কালা চাঁদ বাবু বলেন, “সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা টিকে থাকতে পারবো। এখন খুব কষ্টে দিন পার করছি।”
পিচুটিয়া গ্রামের কারিগর সুশান্ত চন্দ্র ধর বলেন, “এই পাটির কাজ ছাড়া আর কিছু শিখিনি। এটা করেই সংসার চলে। সরকার পাশে না দাঁড়ালে এ শিল্প একদিন পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ। তা না হলে অচিরেই টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পাটি শিল্প শুধুই ইতিহাস আর স্মৃতির পাতায় স্থান পাবে।