
যমুনা রেলসেতুর উত্তর পাশে বৈদ্যুতিক টাওয়ার স্থাপনের জন্য ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত স্তূপ করে রাখা ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার সরকারি বালু লুটের মহোৎসব শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র ও সিরাজগঞ্জের একটি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে রাতের আঁধারে ওই বালু লুট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে সরকার, আর রক্ষক হয়েও বালু রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে ভূঞাপুর উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে অবহিতকরণ পত্র দিয়েছে।
জানাগেছে, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) লিমিটেডের নির্মাণাধীন ‘বড়পুকুরিয়া-বগুড়া-কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের(২য় সংশোধিত)’ আওতায় যমুনা রিভার ক্রসিং অংশে টাওয়ারে ষ্টীল টিউবুলার পাইল ফাউন্ডেশন কাজের নিমিত্তে ডেজিং করণ চলছে। যমুনা রেলসেতুর উত্তর পাশ দিয়ে বৈদ্যুতিক তারের টাওয়ার স্থাপনের জন্য ড্রেজিং করে ষ্টীলের পিলার বসানোর কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ। নিয়ম অনুযায়ী, ড্রেজিংকৃত বালু সরকারের অনুকূলে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তিনটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে স্তূপ করে রাখা হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, যমুনা তীরে এসব বালুর নিয়ন্ত্রণ নিতে ভূঞাপুরের ‘চার খলিফা’ হিসেবে পরিচিত বিএনপি নেতারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। ‘চার খলিফা’ খ্যাত ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু, সিনিয়র সহ-সভাপতি ফরহাদুল ইসলাম শাপলা, নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মন্ডল এবং সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ঠিকাদার সাত্তার কমিশনারের ছত্রছায়ায় প্রতিদিন ট্রাকযোগে ওই সরকারি বালু লুট করা হচ্ছে। তাদের সহযোগী উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ লিটন, নিকরাইল ইউনিয়নের আক্তার হোসেন, আজমীর হোসেন, মিন্টু, রিপন ও রবিনের তত্ত্বাবধানে রাতের আঁধারে সন্ত্রাসী পাহারায় এসব বালু বিক্রি করা হচ্ছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সরকারি এই সম্পদ রক্ষায় যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা থাকলেও প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে এক প্রকার ‘বেঁকায়দায়’ রয়েছে ভূঞাপুর উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্রের মতে, ষ্টীলের পিলার বসানোর কারণে উত্তোলিত নদীতীরের তিনটি স্থানে স্তূপ করে রাখা বালুর মূল্য ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার কম হবেনা। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে বালুগুলো লুট করে নিচ্ছে। প্রভাবশালী চক্রটির রাজনৈতিক চাপের কারণে উপজেলা প্রশাসন ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের অবহিতকরণ পত্র দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, যমুনা নদীতে বৈদ্যুতিক তারের টাওয়ার স্থাপনের জন্য ড্রেজিং করে ষ্টীলের পিলার বসানোর কারণে উত্তোলনকৃত বালু নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বাঁধ তৈরি করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাতের আঁধারে সেই বালু লুট করে বিক্রি করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই বালু সরকারিভাবে নিলামের ব্যবস্থা এবং লুটতরাজকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণ করা হোক। অন্যথায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ পুরোপুরি লুট হয়ে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে।
ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু, নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মন্ডল এবং সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ঠিকাদার সাত্তার কমিশনার জানান, মোবাইল ফোনে নয় এ বিষয়ে সাক্ষাতে বসে বিস্তারিত জানানো হবে। কিন্তু পুরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা এবং বার বার যোগাযোগ করলেও তারা স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। উপরন্তু রাতের আঁধারে বালু লুট অব্যাহত রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) লিমিটেডের সাইট অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ রানা জানান, যমুনা রিভার ক্রসিং অংশে টাওয়ারে ষ্টীল টিউবুলার পাইল ফাউন্ডেশন কাজের নিমিত্তে ডেজিংয়ের কাজ করছে বসুন্ধরা গ্রুপ। ড্রেজিংয়ের ফলে উত্তোলিত ড্রেজড ম্যাটার গুলোর বেশিরভাগ নদীর পানিতেই মিশে যায়। বাড়তিগুলো নদীতীরে রাখার কথা। এ বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপই বলতে পারবে।
ড্রেজিংয়ের কাজে নিয়োজিত বসুন্ধরা গ্রুপের সাইট ইঞ্জিনিয়ার তৌহিদুর রহমান জানান, এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তাদের একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। তারা বালু উত্তোলন করছেন না। যমুনায় ষ্টীলের পিলার বসাতে ড্রেজিং করতে হচ্ছে- ওই কাজ করতে গিয়ে উত্তোলিত বালু নদীতীরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেগুলো মূলত স্থানীয় প্রশাসন দেখভাল করার কথা রয়েছে।
ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) মো. মাহবুব হাসান জানান, বৈদ্যুতিক তারের টাওয়ার স্থাপনের জন্য ড্রেজিং করা বালু সরকারের অনুকূলে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বালুগুলো বুঝিয়ে না দেওয়ায় তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। এ বিষয়ে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ‘অবহিতকরণ’ পত্র দিয়েছেন। তারপরও তিনি মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সরকারি সম্পদরক্ষার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, তারা উপজেলা প্রশাসনের পত্রটি ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে করণীয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।